সোশ্যাল মিডিয়া

ঘড়িগুলো সব মিছে, একটাও আপনার নয়!

স্যার,কেমন আছেন?
-আলহামদুলিল্লাহ, ভাল আছি।

স্যার আপনাকে একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে, অসুস্থ মনে হচ্ছে, হাতে ওটা কি নাড়াচাড়া করছেন? ব্লু কালারের ঘড়ি! সুন্দর তো! দেন তো দেখি একটু ভালো করে,কোথা থেকে কিনেছেন?
-আপনার পরিচয় টা একটু বলবেন প্লিজ!

স্যার, আমার কথা তো আপনার মনে থাকার কথা নয়, আমার চেহারার দিকে আপনি ভাল করে তাকাননি সেদিন,তবে আপনি আমার হাতটা দেখলে চিনতে পারবেন।
-কি খেয়ালি সব কথা বলছেন, পরিচয় দিন ভাই, ইদানীং আমার রাত নামলে মন খারাপ লাগে, বিষন্ন লাগে সব, আর আপনি আরো বেশি মন খারাপ করে দিচ্ছেন।

স্যার, আমার মনটা দুবছর ধরে খারাপ,আমি জানি আপনার লাল ফিতার ঘড়িটা বেশি পছন্দ হয়েছিল,আপনার বন্ধু রিফাতের পছন্দে বাধ্য হয়ে ব্লু টা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন,জানেন স্যার, আপনি দোকান থেকে বের হওয়ার পরপরই অন্য এক ইন্দোনেশিয়ান ভদ্রলোক লাল ঘড়িটা খুশী মনে নিয়ে গেছে,তবে আমার মনে হয় ব্লু ঘড়িটাই বেশি সুন্দর। হাতে একটু সেট করে দেখানতো স্যার!
-এই ঘড়ি এখন ব্যবহার করা যাবে না, ভাইরাস লাগতে পারে! আর এটাতে জীবাণু নাশক দিলে কালারটা নষ্ট হয়ে যাবে। এবার আপনাকে পরিচয় দিতেই হবে,নইলে কথা বন্ধ।

স্যার,আপনার তো আরো কয়েকটা ঘড়ি আছে,ভিয়েতনাম থেকে চেনের যে ঘড়িটা এনেছিলেন ওটা ট্রাই করেন,ওটাতে হেক্সিসল লাগলেও কিছু হবে না,স্টিল তো! স্যার মনে হয় ঘড়ি হোলিক!আমাকে দেখেন,আমার হাতটা খালি,ঘড়িটা নিয়ে যেতে দেয়নি আমাকে!হাতের ঘড়িটার জন্য এখনো অনেক মায়া হয়,গরীব হলেও আপনার মতো আমার হাতেও ঘড়ি থাকতো সবসময়, এমনকি ধান কাটতে গেলেও ঘড়ি ব্যবহার করতাম! তবে স্যার এগুলো কিন্তু আপনার ঘড়ি নয়,দেখবেন, একদিন সবাই আপনার এই পছন্দের ঘড়ি গুলো ভাগ করে নেবে!
-ভাই, আপনি যান তো, যা তা বলে যাচ্ছেন অনেকক্ষণ ধরে! আপনার লাগলে আপনি একটা ঘড়ি নিতে পারেন,তবুও এত কথা বলবেন না প্লিজ, আমাকে একটু একা থাকতে দিন।

স্যার,আপনি তো একাই,বিগত তিন মাস ধরে একাই থাকেন বাসায়,তবে স্যার,একবার একা হয়ে গেলে আর কাউকে পাশে পাওয়া যায় না,এই জীবনে কেউ কেউ আসলেই একা। শোনেন, পরিচয় দিচ্ছি আপনাকে, আমার হাতটা দেখেন,দেখলেই চিনতে পারবেন!
-একি! আপনি উত্তরবঙ্গ থেকে কি করে আসলেন! এখন তো লকডাউন, গাড়িঘোড়া সব বন্ধ! আপনাকে অনেক কষ্ট করে সেদিন পাঠিয়েছিলাম আপনার এলাকায়!

স্যার, আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা স্যার, আপনি আমাকে পাঠালেও সাথে আমার ধানগুলো পাঠাননি, অনেক কষ্ট হয়েছিল, এত পরিশ্রমের ধানগুলো রেখে যেতে। কতদিন,কত পরিশ্রম করে এই ধানগুলো মাইনে পেয়েছিলাম স্যার!
-রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েননি? যা কিছু নিয়ে গেলো সোনার তরী!ধানগুলো ভিজে গিয়েছিল, এগুলো সাথে পাঠানোর সুযোগ ছিলো না!শুধু শুধু আমায় দোষারোপ করছেন আপনি!

স্যার, দোষারোপ করছি না আপনাকে, জানেন স্যার, প্রায় দুই মাস ধরে শরীয়তপুরে মানুষের ধান কেটেছি, দল বেধে এসেছি আমরা, মাইনে হিসাবে অনেক ধান পেয়েছিলাম।ট্রাক ভাড়া করলাম! ধান বোঝাই করলাম,ট্রাকে যেন আর জায়গা নেই!
-এত ধান লোড করলেন কেন? কিছুতো বিক্রি করতে পারতেন,তাছাড়া ঝড়বৃষ্টির রাতে রওনা দেয়াটাও ভুল ছিলো!শরীয়তপুরের রাস্তা অনেক সরু আর মাঝে মাঝে গাড়ি বসে যায়!

তা ঠিকই বলেছেন স্যার, আরো ভাবা উচিত ছিলো আমাদের! আপনি তো এক্সিডেন্টের খবর পাওয়ার পরে আসছেন, এসেই পানির উপর আমার হাতটা ভেসে থাকতে দেখেছেন, আসলে আমার ট্রাকটি যখন কালভার্টের ধাক্কায় উলটে যায় তখন আমি উপর থেকে পুকুরে লাফ দেই কিন্তু কপাল আমার এতটাই খারাপ যে ট্রাকটা গিয়ে আমার উপরেই পড়ে! আমার একটা পা ট্রাকের নিচে চাপা পড়লো!আমি অনেক চেষ্টা করলাম বের হয়ে আসতে কিন্তু পারলাম না,শুধু হাতের কব্জিটাই পানির উপর থেকে দেখা যাচ্ছিল! আমি হাত নেড়ে অনেককে ডাকলাম স্যার,কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি ভয়ে! আপনি যখন আসলেন উদ্ধার করতে ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন প্রায় দুই ঘন্টা চেষ্টা করে যখন আমাকে বের করে আনলো ততক্ষণে আমি লাশ হয়ে গেছি! আমাকে যখন পলিথিনে ভরা হচ্ছিল তখন কেউ আমার হাতটি আর সোজা করতে পারেনি! আপনি আমার হাতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন,দেখছিলেন,আমার হাতের ঘড়ি! আজ অসুস্থতার মাঝে আপনি আপনার হাতের দিকে তাকিয়ে আমার কথাই ভাবছিলেন! আমার হাত ঘড়িটার কথাই ভাবছিলেন! এতদিন পরে হলেও আপনি আমার কথা ভাবছেন বলে ভাল লাগলো।
ভাল থাকবেন স্যার। আর হ্যাঁ, এই সব ঘড়িগুলো সব মিছে।এগুলো একটাও আপনার নয়!
চলি তাহলে…

লেখকঃ এসি (ল্যান্ড), কেরানীগঞ্জ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close