মানবতা

অসহায় হৃদয়ের পাশে ‘ট্রিটমেন্ট ফাউন্ডেশন

ঘটনা-১
০৩/০২/২০২০ইং, সোমবার

সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হওয়ায় নাস্তা না করেই ব্যক্তিগত একটা কাজ সেরে ১১ টায় চলে যাই শাহজাহানপুর। সেখান থেকে বন্ধু ফাইজুলকে নিয়ে গুলশানে এক বড় ভাই এর অফিসে উনার সাথে একটা জরুরি মিটিং এ এটেন্ড করার কথা। কিন্তু রওনা হতে গিয়ে নিশ্চিত হলাম মিটিং টাইম পরিবর্তন করা হয়েছে। সময় পরে জানানো হবে। কি আর করবো? যেহেতু মিটিং আপাতত ক্যানসেল হয়ে গিয়েছে তাই তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম দুজন মিলে কোথাও বসে সাংগঠনিক ব্যাপারে কিছু পরিকল্পনা প্রনয়ণ করে রাখি। যেগুলো এখনো করা হয়নি সময়ের অভাবে।

দীর্ঘ ৪ ঘন্টা বিভিন্ন বিষয়ে আলাপচারিতার পর মনে হলো যে দুপুরের লাঞ্চ টাইম অভার হয়ে গিয়েছে আরো অনেক আগেই। তাই বিদায় নিলাম বাসায় গিয়ে লাঞ্চ করবো বলে। আমার বাসা বাসাবো তে আর ফাইজুল থাকে শাহজাহানপুর কলোনি তে। ওকে ওর বাসার নিচে বিদায় দিয়ে আমি চললাম আমার গন্তব্যে। বাসাবো যেতে হলে আমাকে শাহজাহানপুর থানা ও একটা অভার ব্রিজ ক্রস করে যেতে হয়।

আমি যখন শাহজাহানপুর থানা ক্রস করে প্রায় ব্রিজের কাছাকাছি চলে আসছি তখন হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার অপর প্রান্তে। দেখি ১১/১২ বছরের একটা ছেলে মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে বসে কাঁদছে। মুখ থেকে অঝোর ধারায় রক্ত ঝড়ছে। আমি এগিয়ে গেলাম তার সামনে। আমার মত এমন আরো অনেকেই সেখানে ভীড় জমাচ্ছে। কিছুক্ষণ দেখে তারা আবার চলেও যাচ্ছে। আমি ছেলেটির অবস্থা দেখে কিছুক্ষণের জন্য কোথাও যেনো হারিয়ে গেলাম। নিরবতা ভেঙে তার সমস্যার কথা জানতে চাইলাম, নাম জানতে চাইলাম, বাড়ি কই তাও জানতে চাইলাম বাট সে প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলছে না। তার রেসপন্স নেই। আমার আগ্রহ দেখে পাশের এক দোকানী আন্টি এগিয়ে আসলেন, সে জানালো ছেলেটি কিছুক্ষণ আগে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে এক্সিডেন করে, এতে তার সামনে দাঁত গুলো ভেঙে যায় মাড়ি সহ। তাই সে কথা বলতে পারছে না।

আন্টি এটাও জানালো যে এতক্ষণ হয়ে যাচ্ছে লোকজন আসছে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ এর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসছে না। আমিও খেয়াল করলাম একাধিক চাকুরীজীবি কোট-শুট পরা সাহেবেরা এবং সামর্থ্যবান ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এক নজর দেখে কিংবা না দেখার ভান ধরেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে আসছেন না কেউ। আবার কেউ কেউ তাকে উদ্দেশ্য এমনও বলছে এদের জন্মের কোন ঠিক নেই। এগুলো মরে না কেন? এগুলো এভাবেই পথে ঘাটে মরা উচিত। বিশ্বাস করুন কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছিল। কিন্তু চেয়েও কিছু বলতে পারছি না। পরক্ষণে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এর চিকিৎসার ব্যবস্থা আমিই নিবো। কথাটা আন্টিকে জানাতেই অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন চেয়ে রইলেন আমার দিকে। বললেন বাবারে এতক্ষণ যাবত এতগুলো মানুষকে রিকোয়েস্ট করলাম কেউ আসলো শেষে তুমিই আসলে? দেখে তো মনে হচ্ছে ছাত্র, পারবে? আমি বললাম অবশ্যই পারবো আন্টি, আমাকে পারতেই হবে আর এই ছেলেটির পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক, মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বও বটে।

আমি সাথে সাথে ফোন দিলাম বন্ধু ফাইজুলকে। সে জানালো মাত্র খেতে বসে কয়েক লোকমা মুখে দিয়েছে। আমি বললাম প্লেটটা ওভাবে রেখেই দ্রুত বের হয়ে আয় থানার একটু সামনে। সাথে সাথে ফোন দিলাম কাছের এক ছোট ভাই শুভ কে, জানতে চাইলাম কই আছো? সে জানালো খিলগাঁও, তাকেও বললাম থানার সামনে আসো। টাইম জানতে চাইলাম কতক্ষণ লাগবে? সে বললো ভাই ৫ মিনিট, তাকেও দ্রুত আসার তাগিদ দিয়ে বললাম ২ মিনিটের মধ্যে আসতে। আমার ফোন পেয়ে মূহুর্তের মধ্যে ওরা এসে হাজির। বললাম ছেলেটিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যেতে হ.বে একটা রিকশার বন্দোবস্ত করতে করো। আমরা রিকশা ওয়ালাদের জিগ্যেস করতেই কেউ রাজি হচ্ছে না। যেখানে মানবিকতার বিষয়, খুব সহজেই তাদের যাওয়ার কথা সেখানে তারা পুরো উল্টো।

কত ভাবে আকুতি মিনতি করলাম বাট কোন কাজই হলো না, কাউকেই রাজি করাতে পারিনি। এদিকে ছেলেটির মুখ থেকে এত পরিমাণ রক্ত ঝড়ছে যে, সে যেখানে বসা ছিল সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে অনেক টা জায়গা ভিজে গিয়েছে। তাই আমি আর ফাইজুল ওকে আমাদের দুই কাঁধে ভর করে সামনে এগুতে লাগলাম। যদি রিকশা পাই সেই আশায়। এদিকে আন্টি কিছু টাকা হাতে গুজে দিয়ে বললেন এটা নাও। কাজে লাগবে। মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে আমাদের বিদায় দিলেন। এটাও বললেন পরে যেন উনার সাথে দেখা করে সার্বিক বিষয় গুলো জানাই। (বলে রাখা ভালো যে আমরা ওই দিনের সকল কার্যক্রম পরিপূর্ণ শেষ করে রাত ১২ কি সাড়ে ১২ টায় আন্টির সঙ্গে দেখা করে সব ডিটেইলস শেয়ার করেছিলাম, এতে আন্টি আমাদের কি পরিমাণ খুশি হয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।)আমরা কিছু পথ হেঁটে যেতেই দেখি আরো একটি রিকশা আসছে। উনাকে বলায় উনিও রাজি না। পরে জোড়াজুড়ি ও ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাসে রাজি হলেন।

এর মধ্যে ফাইজুল ফোন দিলো ওর বন্ধু ইমরান কে। সে আসবে তাই রিকোয়েস্ট ওর অপেক্ষায় যেনো আমরা সামনে একটু রিকশা থামিয়ে দাঁড়াই। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি এখানে বেশ উৎসুক জনতার ভীড় জমে গিয়েছে। সকলের অসংখ্য প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি আমরা। এরই মধ্যে কয়েকজন জ্ঞান দিতে শুরু করলেন- তোমাদের খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই? এই ছেলেকে নিয়ে গেলে তোমরা ফেঁসে যাবা, পুলিশ বলবে তোমার মেরে তারপর ওকে মেডিকেল নিয়ে আসছো, এর পরিচয় জানো না, ঠিকানা জানো না, এসব ছাড়া চিকিৎসা হয় নাকি? এসব ছেলে পেলে রাস্তা ঘাটে থাকে, এরা প্রতিদিন এমন এক্সিডেন করে আবার এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়, তোমাদের এসব ঝামেলায় ঝড়ানোর প্রয়োজন নেই, আইনটি জটিলতায় ফেঁসে যাবা।আমাদের কথা হলো- আরে ভাই আগে আইন না মানবতা? মানুষ না বাঁচলে আইন কার জন্যে? মানবিক কাজ নিজে না করুন অন্য কে নিরুৎসাহিত করেন কেন? নিজে ফেঁসে গিয়ে যদি অন্যের বিন্দু মাত্র উপকার হয় তবে আমি একবার নয় শতসহস্র বার ফেঁসে যেয়েও উপকার করতে রাজি আছি। নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও চাই ভালো থাকুক অন্যরা।দীর্ঘ জ্যাম পেরিয়ে সন্ধ্যায় পৌঁছে গেলাম ঢাকা মেডিকেল। টিকিট কাটার আগে জানতে চাইলাম তার নাম (যেহেতু কাউন্টারে বলতে হবে তাই), কথা বলতে পারে না তবুও সে বহু কষ্ট করে জানালো তার নাম হৃদয়। বয়স আমরা আনুমানিক দিয়ে নিয়ে আসলাম টিকেট। কোন সমস্যা হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close